ইসলামে হারাম কাজ এবং প্রচলিত খারাপ কাজ:
হারাম একটি আরবি শব্দ, যার আক্ষরিক অর্থ ‘নিষিদ্ধ’। ইসলামি পরিভাষায়, হারাম বলতে এমন কাজ, বস্তু বা প্রাণী বোঝানো হয় যা কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ ও বর্জনীয়। আপনার কাছে পছন্দনীয় বা ভালো মনে হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে নিষেধ হলে তা অবশ্যই বর্জনীয়। ইসলামে হারাম কাজ বলতে নিষিদ্ধ বা অননুমোদিত কাজ, বস্তু বা প্রাণী বোঝানো হয়, যা পবিত্র কোরআন ও হাদিসের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হারাম কাজের উদাহরণগুলোর মধ্যে রয়েছে মানুষ হত্যা, চুরি, মদ্যপান, সুদ, ঘুষ, ব্যভিচার, মৃত পশুর মাংস খাওয়া এবং আল্লাহর ছাড়া অন্য কারো উপাসনা করা। ইসলামে সুদ, জুয়া, মাদকদ্রব্য তৈরি বা বিক্রি, মৃত ও শূকরের মাংস বেচা, পতিতাবৃত্তি ও অন্যান্য নিষিদ্ধ কাজ বা পণ্যের সাথে জড়িত চাকরিগুলো হারাম। এ ধরনের কাজের উপার্জন বৈধ নয় এবং এই ধরনের চাকরি থেকে বিরত থাকা ও হালাল বিকল্প খুঁজে বের করা জরুরি।
ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাংকের চাকুরিকে সুদ সংশ্লিষ্ট কাজের সাথে যুক্ত থাকার কারণে হারাম মনে করা হয়, কারণ সুদ গ্রহণ ও প্রদান ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। যারা সরাসরি সুদের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে, যেমন সুদ গ্রহণ বা প্রদানের সাথে জড়িত থাকে, অথবা সুদের কাজে সহায়তা করে, তারা সবাই সমানভাবে অপরাধী বলে গণ্য হয়। তবে, যদি ব্যাংকের কাজে সরাসরি সুদ সংশ্লিষ্ট না থাকে এবং কোনো হালাল(বৈধ) কাজ করা হয়, যেমন কোনো সেবা প্রদান বা সম্পদ বিক্রয়, দাড়োয়ানের কাজ, বাবুর্চির কাজ, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ, তাহলে তা জায়েজ হতে পারে।
কেনো ব্যাংকের চাকুরি হারাম হতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের সুদ বিশ্লেষণের অন্দর মহলে প্রবেশ করতে হবে। ব্যাংক সাধারণত সুদভিত্তিক লেনদেনের সাথে জড়িত, যা ইসলামে হারাম। যারা ব্যাংকে চাকরি করে এবং সরাসরি সুদের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকে, যেমন সুদ গ্রহণ বা প্রদান, তাদের চাকরি হারাম বলে গণ্য হতে পারে। সুদ যারা গ্রহণ করে বা প্রদান করে, তাদের সাক্ষী হিসেবে যারা কাজ করে, তারাও সমানভাবে অপরাধী বলে বিবেচিত হয়।
কখন ব্যাংকের চাকুরি জায়েজ হতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা এতটা সহজ নয়। যদি ব্যাংকের কাজে সরাসরি সুদ সংশ্লিষ্ট না থাকে, যেমন কোনো হালাল (বৈধ) সেবা প্রদান করা, তাহলে সেই কাজ জায়েজ হতে পারে। রাষ্ট্রায়ত্ত বা বিশেষায়িত সরকারি ব্যাংকের কিছু কাজে সরাসরি সুদ সংশ্লিষ্ট না থাকলে, যেমন কোনো বৈধ সার্ভিসে যুক্ত থাকা, তা জায়েজ হতে পারে। একটি চাকুরি হালাল নাকি হারাম, তা নির্ভর করে সেই চাকুরিতে কী ধরনের কাজ করা হচ্ছে তার ওপর।ইসলামী শরিয়া মোতাবেক সুদভিত্তিক লেনদেন হারাম হওয়ার কারণে ব্যাংকের যে কাজগুলো সরাসরি সুদের সঙ্গে যুক্ত, সেগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে কি ইহা সম্ভব? কক্ষনো না। কারণ, ব্যাংকে তো আপনি আপনার ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করতে পারবেন না। আপনাকে, আপনার উর্ধতন কর্মকর্তা যে কাজ দিবেন সেইটাই করতে হবে। এমতাবস্থায় আপনি যতো সতর্কতাই অবলম্বন করুন না কেনো, আপনি হারামে ডুবে যাবেনই। এইক্ষেত্রে কিছু আলেম বা সমাজের ভালো মানুষ আছে, যাদেরকে অনেকে আইডল মনে করে তারা এই দেশের হাজার হাজার তরুণদের হারামে ডুবে যেতে পিছন থেকে একরকম উৎসাহ ই দেই, আমি বলবো। কারণ, হারাম চাকরি করা ছেলেটার সাথে যখন একজন ইসলামের অগাধ জ্ঞানের অধিকারী আলেমের অনেক গভীর সম্পর্ক থাকে কিন্তু ঐ আলেম কখনো তাকে হারাম চাকরির ব্যাপারে কোনো রকম কোনো পরামর্শ বা নিষেধ করে তো না, বরং উল্টো তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকে। আমি বলতে চাই, এই ধরনের আলেমরুপী জালেমদের কারণে তরুণরা বিপথগামী হচ্ছে। আমার আপনার আশেপাশে এই ধরনের অনেক ইসলামী স্কলার দেখবেন একজন সুদী কাজের সাথে জরিত ব্যক্তির সাথে অনেক সুসম্পর্ক। সুসম্পর্ক থাকুক, কোনো সমস্যা নাই, কিন্তু আপনার তো তার শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে তার ভুল গুলো ধরিয়ে দেওয়া সুন্নতের অংশ। কিন্তু আপনি তা এড়িয়ে যান, শুধু সম্পর্ক নষ্ট হবে এই ভয়ে। বান্দার সাথে ভালো সম্পর্ক রাখার জন্য আপনি আল্লাহর সাথে সম্পর্ক খারাপ করলেন, আপনি কিসের আলেম!
আমাদের অবশ্যই স্বীকার করবে হবে, সুদের সাথে জড়িত এমন চার প্রকার লোক অভিশপ্তঃ
(১) যে ব্যক্তি সুদ খায়,
(২) যে সুদ দেয়,
(৩) যে সুদের কথা লিখে রাখে এবং
(৪) যারা সুদের সাক্ষী হয়।
তাদের সবার উপরে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম লা’নত(অভিশম্পাত) করেছেন। নবী কারিম(সাঃ) আরো বলেছেন, “এই সবগুলো মানুষ পাপের দিক থেকে সমান।” (হাদীসটি ‘সহীহ’)
এইরকমভাবে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম মদের সাথে সংশ্লিষ্ট দশ প্রকারভব্যক্তির ওপর লা’নত(অভিশম্পাত) করেছেনঃ
(১) যে ব্যক্তি মদ তৈরী করে,
(২) যে ব্যক্তি মদ তৈরী করার নির্দেশ দেয়,
(৩) যে ব্যক্তি মদ পান করে,
(৪) যে ব্যক্তি মদ বহন করে,
(৫) যার জন্য মদ বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়,
(৬) যে ব্যক্তি অন্যকে মদ পান করায়,
(৭) যে ব্যক্তি মদ বিক্রি করে,
(৮) যে ব্যক্তি মদের উপার্জন ভোগ করে,
(৯) যে ব্যক্তি মদ ক্রয় করে এবং
(১০) যার জন্য মদ ক্রয় করা হয়।
মদের চেয়ে প্রিয় নবী মুহাম্মদ রাসুল(সাঃ) সুদের প্রতি বেশি কঠোরতার তাগিদ দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম সুদের সাথে সংশ্লিষ্ট দশ প্রকার ব্যক্তির ওপর লা’নত(অভিশম্পাত) করেছেন।
সুদের সাথে জড়িত দশ ব্যক্তি হলেনঃ
১। সুদখোর-যে সুদ গ্রহণ করে,
২। সুদদাতা-যে সুদ দেয়,
৩। সুদের লেখক-যে সুদের হিসাব লিখে,
৪। সুদের সাক্ষীদ্বয়-যারা সুদের লেনদেনে সাক্ষী থাকে,
৫। সুদখোরের সাহায্যকারী-যে সুদের কারবারে সহায়তা করে,
৬। সুদ গ্রহীতার পরিচালক-যে সুদগ্রহীতাকে সহায়তা করে,
৭। সুদগ্রহীতার সহযোগী-যে সুদের কারবারে সাহায্য করে,
৮। সুদগ্রহীতার অংশীদার-সুদের কারবারে যে অংশীদার,
৯। সুদগ্রহীতার এজেন্ট-যে সুদের লেনদেনে এজেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং
১০। সুদগ্রহীতার বন্ধু-যে সুদের কারবারে বন্ধু হিসেবে সমর্থন জোগায়।
এই ব্যক্তিরা সবাই সুদ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে জড়িত থাকার কারণে অভিশপ্ত। কোরআন ও হাদিসে সুদের লেনদেনকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং এর সাথে জড়িত ব্যক্তিদের ওপর অভিশাপ দেওয়া হয়েছে। সাহাবি জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) সুদ সংশ্লিষ্ট এই দশজন ব্যক্তির ওপর লা’নত(অভিশাপ) করেছেন।
প্রচলিত হারামের বাইরে কিছু হারাম কাজ ও বিষয় আছে যেগুলো থেকে আমাদের বিরত থাকা জরুরি। এই কাজগুলো আমরা অনেক সময় না বুজে বা হালকা হিসেবে নিয়ে থাকি। যেইটা আমার কাছে হালকা বা সামান্য সেইটা যে ইসলামে নিষিদ্ধ তা আমরা বুঝতে পারি না অনেক ক্ষেত্রে। এমন কিছু কাজ বা খাবার আছে যেগুলো হারাম, সে সম্পর্কে আমাদের স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। স্বাভাবিকভাবে, মরা পশুর মাংস খাওয়া হারাম। যে প্রাণী আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে জবেহ করা হয়, তা খাওয়া হারাম। সিংহ, বাঘ, নেকড়ে, কুকুর, বিড়ালের মতো মাংসাশী প্রাণী এবং শিংবিহীন গাধা ও ঘোড়ার মাংসও হারাম। কিছু বিষাক্ত মাছ বা জলজ প্রাণী খাওয়া হারাম হতে পারে। মিথ্যা বলা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া এবং গীবত করা(অন্যের দোষ চর্চা করা) হারাম। অশ্লীল ছবি দেখা, কুৎসিত গান শোনা এবং যেকোনো প্রকারের যৌন অন্যায় কাজ হারাম। অন্যের প্রতি হিংসা করা বা লোভ করাও ইসলামে হারাম। নিজের দায়িত্বে অবহেলা করা এবং কাজে ফাঁকি দেওয়াও এক ধরনের হারাম। যে কাজ বা ব্যবসা অন্যের হতে পারতো কিন্তু আমি ছলেবলে বা কৌশলে নিজের করে নিলাম, এইটাও হারাম। নিজের যোগ্যতার চেয়ে বেশি যোগ্যতাসম্পূর্ণ ব্যক্তিকে পাশকাটিয়ে অবৈধভাবে কিছু হাসিল করাও হারাম। শালীনতা ও ইসলামি শিক্ষার পরিপন্থী পোশাক পরাও হারাম। এই বিষয়গুলো প্রচলিত হারামের তালিকা থেকে ভিন্ন, তবে এগুলোও ইসলামে নিষিদ্ধ।
এখানে কিছু খারাপ কাজ যাহা ইসলাম ধর্মের পরিভাষায় ‘কবিরা গুনাহ’ এবং মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে ক্ষতিকর কিছু অভ্যাস বিশ্লেষণ করছি। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উপাসনা করা। আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল (সাঃ)-এর ওপর মিথ্যা আরোপ করা। আল্লাহর দয়া থেকে আশা ছেড়ে দেওয়া। পিতা-মাতার কথা না শোনা বা তাদের প্রতি অসম্মান দেখানো। পরকীয়া বা অবৈধ যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা। অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণ করা। একই লিঙ্গের মানুষের মধ্যে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা। প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার আগ্রহ না থাকা। কোনো কাজ শুরু করার আগে সব পারফেক্ট হওয়ার জন্য অপেক্ষা করা, যা অনেক সময় কাজ শুরু করতেই বাধা দেয়। প্রতিনিয়ত নিজেকে অন্যদের সাথে তুলনা করা। অনেক বেশি চিন্তা করা কিন্তু সেই অনুযায়ী কোনো কাজ না করা। দীর্ঘ সময় ধরে মন খারাপ থাকা এবং যেসব কাজ আগে আনন্দ দিত, তাতে আনন্দ না পাওয়া।
আল্লাহর কাছে বিনীতভাবে প্রার্থনা করি, আল্লাহ আপনি আমাদের সকল প্রকার গুনাহের কাজ থেকে বিরত রাখুন। আমরা যেন আপনার নির্দেশিত পথে চলতে পারি সেই তৌফিক দিন। মুহাম্মদ (সাঃ) এর সুন্নতের মর্যাদা ভাবগাম্ভীর্যের সাথে মানতে পারি সেই ফয়সালা করে দিন। আমরা যেন, ছোট বা বড় সব ধরনের খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকি সেই দোয়া চাই। খারাপ কাজ বা ভালো কাজ এইটা কিন্তু আমাদের চিন্তার উপর নির্ভর করে না। বাস্তবতা আমাদের মেনে নিতে হবে। আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় খারাপ কাজ কোনটি, এটি নির্ভর করে আপনি-আমি কোন প্রেক্ষাপটে এটি বিবেচনা করছি তার উপর। যেমন, ধর্মীয়, সামাজিক বা ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে এর সংজ্ঞা ভিন্ন হতে পারে। তবে, সর্বজনীনভাবে সবচেয়ে বড় খারাপ কাজ হিসেবে আল্লাহ্র সাথে শিরক করা(অন্য কারো উপাসনা করা) এবং হত্যা করা, মিথ্যা বলা, চুরি করা ও পিতামাতার অবাধ্য হওয়াকে প্রধান খারাপ কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যখন আমরা হারাম কাজে সুখ খুঁজবো, আর হালাল কাজকে বোঝা মনে করবো তখন বুঝে নিতে হবে, আমাদের হৃদয় থেকে আল্লাহর হেদায়েত উঠে যাচ্ছে!