১৯শে জুলাই, দিনটি ছিল শুক্রবার। জুলাই শুরু হওয়ার পর সবচেয়ে বড়ো ঘটনা ছিল যাদের সাথে মাসের পর মাস যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল, তারা ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলত। এমনও রাত পার হতো শুধু কথা বলতে বলতে। সবার ভেতর কেমন যেন একটা উৎকণ্ঠা। ১৯ তারিখ থেকে শুরু হয় নির্ঘুম রাত। কেমন যেন অন্যরকম এনার্জি চলে এসেছিল। সেই এনার্জি সাহসের, মৃত্যুর পরোয়া না করার মানসিকতা। শুক্রবার এক ভাই ফোন দিল। বললো, এভাবে ঘরে বসে থাকা যায় না। বাচ্চাদের উপর টর্চার চলছে। রংপুরে আবু সাইদ, চিটাগং ওয়াসিমের মৃত্যুর দৃশ্য আমাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে। বড়ো ভাইয়ের সদ্য বছর পার না হওয়া একটা বাচ্চা আছে। বউয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসলো দুপুরের পরপর। আমরা বের হলাম, যেখানে লোক জড়ো হবে সেখানেই স্থান নিব। দু’জন কিছু পথ রিকশা নিয়ে কিছু পথ হেঁটে হেঁটে গেলাম। অসংখ্য মানুষ! বাঁশের কঞ্চির মতো দুইজন দুইটা লাঠি হাতে নিলাম সামনে ছাত্রলীক, সাজসজ্জায় ভর্তি পুলিশ। বুলেটের সামনে কঞ্চির মতো লাঠি আর কংক্রিটের টুকরো নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে হাজার হাজার ছাত্র জনতা। সেই দৃশ্য দেখার মতো। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার ইতিহাসের চিত্রপট ফুটে উঠেছে। ইতিহাসের সাক্ষী হতে এসেছি। বুলেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হলেও আফসোস নাই। সেদিন অপর পাশ থেকে মুহুর্মুহু ইট পাটকেলের ছোড়াছুড়ি। কারো মাথাভর্তি রক্ত হাত দিয়ে চেপে নিয়ে যাচ্ছে, কেউ লুটিয়ে পড়ছে রাস্তার উপর। সেদিনের একটা বীভৎস আক্রমণের দৃশ্য আমাকে এখনো তাড়া করে বেড়ায়। আমি অক্ষত আছি হয়তো আমার উপরে পড়া কংক্রিটের টুকরো অন্য জনের উপর পড়ার কারণে। যারা মাঠে ছিল একমাত্র তারাই এটার অনুধাবন করতে পারবে। এই যে আমাদের বেঁচে থাকা অন্য কারো জীবনের বিনিময়ে। ৫ই আগস্টের স্নাইপারের ভয়াবহ আক্রমণের শব্দ এখনো কানে বাজে। রাস্তার পাশে কোনো পিলারের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য হয়তো রাস্তায় গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়া ছেলেটার মতো আমিও লুটিয়ে পরিনি। পিলারের আড়াল থেকে বের হয়ে পাশের গলির ভেতর ঢুকি। গুলির শব্দ শুনতে শুনতে একটা বাসার সামনে দাঁড়াই। সেখান থেকে বের হয়ে তরতাজা রক্তে ভেজা রাস্তা দেখে স্তব্ধ হওয়ার আগেই শুনেছিলাম হাসিনা পলায়ন। রক্তে ভেজা রাস্তা দিয়ে পা-দাপিয়ে হেঁটেছি আর স্লোগান দিয়েছি হাসিনা পলায়নের, ‘পলাইছেরে পলাইছে, শেক হাসিনা পলাইছে’ আমার জীবনের সেরা স্লোগান। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত পুরো দেশ, ছাত্র জনতার ঢল নেমেছে গণভবনমুখী হয়ে। সেই রক্তে ভেজা দৃশ্য আমাকে এখনও ক্ষতবিক্ষত করে। কোনোদিন হয়তো আর ভুলতে পারব না। ১৯শে জুলাই বেশ রাত করে রুমে ফিরে আসলাম। চারদিকে গুঞ্জন শুনি, কেমন যেন একটা দম বন্ধ বন্ধ ভাব। বাসায় বাসায় পুলিশ ঢুকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। সারা রাত জেগে ছিলাম এই বুঝি পুলিশ আসলো এই আতঙ্ক নিয়ে। ঘুম, খাওয়া-দাওয়া কিছু ছিল না। কিন্তু ক্লান্তিও আসলো না এটা আশ্চর্য হওয়ার মতো বিষয়। জুলাই এসেছিল সকল ক্লান্তি দূর করার জন্য, হাসিনার মতো ভয়ংকর ক্লান্তি আর কিছু ছিলো না। আমাদের জুলাই সেই ক্লান্তি দূর করেছে। আমরা আর এমন ক্লান্ত হতে চাই না, ভবিষ্যতে এমন ফ্যাসিস্ট যেন কেউ না হয়। জুলাই অনেক রক্তের বিনিময় আমাদের হয়েছে। সেই রক্ত যেন বৃথা না যায়। ‘২৪ এর মতো এমন জুলাই যেন আর না আসে।
আবুল বাশার