সরকারি নীতিমালা অমান্য করে নিজেদের খেয়াল খুশি মতো ফি নিচ্ছে দোহারের ড্যাফোডিলস হাই স্কুল। তাদের কর্মকাণ্ডে মনে হচ্ছে তারা সরকারের আইনের অধীনে নয় বরং সরকারই তাদের অধীন। তারা নিজেরাই তাদের খেয়াল খুশি মত আর্থিক ব্যবস্থাপনা করছে । সরকারের উপর তারা যেন আরেক সরকার ।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী মুদ্রণ বা ছাপা (যেমন সিলেবাস,রেজিস্ট্রেশন,অগ্রগতির প্রতিবেদন ইত্যাদির জন্য) ১৫০ টাকা, টিফিনের জন্য (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ) মাসিক ১০০ টাকা, ম্যাগাজিন এর জন্য (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ) বার্ষিক ৭৫ টাকা, ক্রীড়া ফি বার্ষিক ১০০ টাকা, সাংস্কৃতিক /বিতর্ক অনুষ্ঠানের জন্য বার্ষিক ৭৫টাকা, বিভিন্ন জাতীয় দিবস উৎযাপনের জন্য বার্ষিক ৭৫ টাকা, বিভিন্ন ক্লাব গঠনের জন্য ২৫ টাকা , ধর্মীয় অনুষ্ঠান (মিলাদ /পূজা) এর জন্য বার্ষিক ৭৫ টাকা , লাইব্রেরি ফি বার্ষিক ২০ টাকা, কল্যাণ বা দরিদ্র তহবিলের জন্য বার্ষিক ২৫ টাকা , আইসিটি প্রতিমাসে ২৫ টাকা হারে বার্ষিক ৩০০ টাকা , বাগানের জন্য বার্ষিক ৬০ টাকা, ল্যাবরেটরি /গবেষণাগার এর জন্য বার্ষিক ২০ টাকা ,কমনরুমের জন্য বার্ষিক ১০ টাকা ,পরিচয়পত্র প্রদানের জন্য বার্ষিক ৭৫ টাকা , অত্যাবশ্যকীয় ব্যয়ের জন্য বার্ষিক ৫০ টাকা , নবীনবরণ /বিদায় সংবর্ধনার জন্য বার্ষিক ৩০ টাকা , মসজিদ / ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ) এর জন্য বার্ষিক ২০ টাকা , চিকিৎসা সেবা (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ) প্রদানের জন্য বার্ষিক ১০ টাকা , বিবিধ /আনুষঙ্গিক ব্যয় বার্ষিক ৫০ টাকা , উন্নয়ন ফি (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ) বার্ষিক পৌরসভার বাইরে হলে ৫০০ টাকা , পৌরসভার ভেতরে হলে ১০০০ টাকা, বিদ্যুৎ ফি (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) পৌরসভার বাইরে হলে বার্ষিক ১০ টাকা , শিক্ষা সফরের জন্য বার্ষিক ৫০ টাকা , সাঁতার প্রশিক্ষণের জন্য (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ) ১০ টাকা, স্কাউট ফি নির্ধারণ করবে বোর্ড। এ সব খাতের ফি যোগ করলে কোনো ভাবেই ১৮০০ টাকার বেশি আসে না।
সব খাতের ফি যোগ করলে প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণীর ভর্তি কার্যক্রমে সরকার নির্ধারিত মোট ফি সর্বোচ্চ ১৮০০ টাকা
অথচ ড্যাফোডিলস হাই স্কুলে প্লে শ্রেণিতে ভর্তি করতে মোট ফি ৬০৮০ টাকা। নার্সারিতে নতুন ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ৫৯৪০ টাকা ও পুরানদের জন্য ৫০৩০ টাকা। প্রথম শ্রেণিতে নতুনদের জন্য ৫৫৪০ টাকা ও পুরনোদের ৪৬৩০ টাকা। দ্বিতীয় শ্রেণিতে নতুনদের জন্য ৫৭৯০ টাকা ও পুরনোদের ৪৮৮০ টাকা । তৃতীয় শ্রেণিতে নতুনদের জন্য ৬৬৯০ টাকা ও পুরনোদের জন্য ৫৫৭০ টাকা । চতুর্থ শ্রেণির জন্য ৬৩২০ টাকা ও পুরানদের জন্য ৫৬০০ টাকা। পঞ্চম শ্রেণির নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য৬৩২০ টাকা আর পুরাতনদের জন্য ৫৬০০টাকা । ষষ্ঠ শ্রেণির নতুনদের জন্য ৭৪২০ টাকা এবং পুরানদের জন্য ৬৭০০ টাকা । ৭ম শেণির নতুন ছাত্রছাত্রীর ৭৪২০ টাকা, ৬৭০০ টাকা পুরানদের জন্য । অষ্টম শ্রেণির নতুনদের ৮৪২০, পুরানদের জন্য ৭৭০০ টাকা । নবম শ্রেণির নতুনদের জন্য ৮৭২০ টাকা আর পুরানদের জন্য ৮০০০ টাকা ।
সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন করে স্কুলের নোটিস বোর্ডে তথ্য না দিয়ে গোপন করে প্লে শ্রেণিতে ৩৫২০ টাকা, নার্সারিতে ২৪০০ টাকা, প্রথম শ্রেণিতে ২৫০০ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ২৫০০ টাকা, তৃতীয় শ্রেণিতে ২৯০০ টাকা, চতুর্থ শ্রেণিতে ৩৫০০ টাকা, পঞ্চম শ্রেণিতে ৩৮০০ টাকা, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৪৯০০ টাকা, সপ্তম শ্রেণিতে ৪৯০০ টাকা , অষ্টম শ্রেণিতে ৫৯০০ টাকা, নবম ও দশম শ্রেণিতে ৬২০০ টাকা করে বেশি নেওয়া হচ্ছে।
সেশন ফি নামে নীতিমালায় কোনো খাত নেই । নীতিমালা লঙ্ঘন করে ড্যাফোডিলস হাই স্কুলে ‘সেশন ফি‘ নাম দিয়ে অবৈধভাবে ‘ প্লে’ শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত ২৩০০ টাকা, তৃতীয় শ্রেণিতে ২৫০০ টাকা, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে ২৭০০ টাকা, ষষ্ঠ শ্রেণীতে ৩৫০০ টাকা, সপ্তম শ্রেণিতে ৩৫০০ টাকা, অষ্টম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ৪০০০ টাকা করে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে আদায় করা হয়েছে ।
বিদ্যুৎ ফি (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) পৌরসভার বাইরে হলে বার্ষিক ১০ টাকা
ড্যাফোডিলস হাই স্কুলে শ্রেণিভেদে আলাদা জেনারেটর বিল নেওয়া হয়। প্লে শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত জেনারেটর বিল ৬০০ টাকা, তৃতীয় শ্রেণির জেনারেটর বিল ৭০০টাকা, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির বিল ৯০০ টাকা করে । ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত জেনারেটর বিল ১০০০ টাকা।
সরকারি বার্ষিক ক্রীড়া ফি ১০০ টাকা । ড্যাফোডিলস হাই স্কুল নিচ্ছে ৫০০টাকা।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী কত টাকা বেতন নিতে পারবে ?
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দোহারের পৌরসভার বাইরের নন এমপিও স্কুলগুলো প্রথম শ্রেণি থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত মাসিক টিউশন ফি সর্বোচ্চ ৭০০ টাকা, চতুর্থ শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত টিউশন ফি সর্বোচ্চ ৮০০ টাকা, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৯০০ টাকা ও নবম-দশম শ্রেণির জন্য সর্বোচ্চ ১০০০ টাকা টিউশন ফি নিতে পারবে। এর বেশি নিতে পারবে না। ড্যাফোডিলস হাই স্কুল পৌরসভার বাইরে। তাই ড্যাফোডিল হাই স্কুলেও সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণিতে মাসিক টিউশন ফি সর্বোচ্চ ৯০০ টাকার বেশি নিতে পারবে না। আর নবম ও দশম শ্রেণির জন্য মাসিক টিউশন ফি (বেতন) ১ হাজার টাকার বেশি নিতে পারবে না।
ড্যাফোডিল হাই স্কুল বেতন নিচ্ছে কত ?
ড্যাফোডিলস হাই স্কুল ঘুরে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। এখানে কোনো কোনো শ্রেণিতে সরকারি ফি’র চেয়ে আড়াইগুণ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। ড্যাফোডিল হাই স্কুলে প্লে শ্রেণিতে ৮০০ টাকা, নার্সারিতে ৮০০ টাকা, প্রথম শ্রেণিতে ৯০০ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৯০০ টাকা, তৃতীয় শ্রেণিতে ১০০০ টাকা, চতুর্থ শ্রেণিতে ১২০০ টাকা, পঞ্চম শ্রেণিতে ১৫০০ টাকা, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ১৭০০ টাকা, সপ্তম শ্রেণিতে ১৭০০ টাকা, অষ্টম শ্রেণিতে ২২০০ টাকা, নবম ও দশম শ্রেণিতে ২৫০০ টাকা করে মাসিক টিউশন (বেতন)ফি নেওয়া হচ্ছে।
সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্লে শ্রেণিতে ১০০ টাকা, নার্সারিতে ১০০ টাকা, প্রথম শ্রেণিতে ২০০ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ২০০ টাকা, তৃতীয় শ্রেণিতে ৩০০ টাকা, চতুর্থ শ্রেণিতে ৪০০ টাকা, পঞ্চম শ্রেণিতে ৭০০ টাকা , ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৮০০ টাকা, সপ্তম শ্রেণিতে ৮০০ টাকা, অষ্টম শ্রেণিতে ১৩০০ টাকা, নবম ও দশম শ্রেণিতে ১৫০০ টাকা করে মাসিক বেতন বেশি নেওয়া হচ্ছে।
দশম শ্রেণিতে বেতন নিচ্ছে সরকারি ফি’র দ্বিগুনেরও বেশি
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নবম ও দশম শ্রেণির জন্য মাসিক টিউশন ফি (বেতন) ১ হাজার টাকার বেশি নিতে পারবে না। নবম ও দশম শ্রেণিতে ২৫০০ টাকা করে মাসিক টিউশন (বেতন)ফি নেওয়া হচ্ছে ড্যাফোডিলস হাই স্কুলে।
প্রতিপত্রে ৩ ঘণ্টার পরীক্ষার জন্য সরকারি ফি ৪০ টাকা । তিন ঘণ্টার কম হলে প্রতিপত্রে ৩০ টাকা।
ড্যাফোডিল হাই স্কুলে প্রতিপত্রের পরীক্ষার জন্য ১০০ টাকা করে ফি নেওয়া হচ্ছে । নবম শ্রেণিতে ৩ ঘণ্টার ১০ টি পরীক্ষার জন্য সরকারি ফি ৪০*১০ বা ৪০০ টাকা। ড্যাফোডিল হাই স্কুলে নেওয়া হচ্ছে ১০০০ টাকা।
নন এমপিও স্কুলগুলোর বেতন নির্ধারণ করবে কে ?
সরকার ১ম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মাসিক বেতন সর্বোচ্চ কত নেওয়া যাবে তা নির্ধারণ করে দিয়েছে । আইন অনুযায়ী নন এমপিও স্কুলগুলোর বেতন নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট স্কুলের পরিচালনা কমিটি । তবে সরকারের নির্ধারণ করা সর্বোচ্চ বেতনের নিম্নে থাকতে হবে।
স্কুলগুলো সরকারের নির্ধারিত ফি’র চেয়ে অতিরিক্ত ফি আদায় করছে কিনা এটা দেখার দায়িত্ব কার ?
স্কুলগুলো সরকারের নির্ধারিত ফি’র চেয়ে অতিরিক্ত ফি আদায় করছে কিনা এটা মনিটরিং করবে জেলা শিক্ষা অফিসার এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ।
এ বিষয়ে ঢাকা জেলা শিক্ষা অফিসার মো. আব্দুল মজিদ বলেন, আমি এ বিষয়ে ওদের সাথে কথা বলব। এ বিষয়ে দোহার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার রকিব হাসান বলেন, আমার কাছে এ ধরনের তথ্য আসে নি । এখন খুঁজ নিব ।
অতিরিক্ত ফি আদায় দুর্নীতি কি না ?
সরকারি টিউশন ফি নীতিমালায় বলা হয়েছে, সরকার নির্ধারিত বেতন বা টিউশন ফি সংক্রান্ত তথ্য আবশ্যিকভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নোটিশ বোর্ডে প্রদর্শন করতে হবে। ড্যাফোডিলস হাইস্কুলের নোটিশ বোর্ডে সরজমিন ঘুরে সরকার নির্ধারিত টিউশন ফি সংক্রান্ত কোনো তথ্য দেখা যায় নি। ড্যাফোডিলস হাই স্কুলের বোর্ডে ভর্তি সংক্রান্ত সরকারি তথ্য না পেয়ে ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকরা প্রতারিত হচ্ছে ।
দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের তফশিল অনুসারে প্রতারণা করে আয় দুর্নীতি। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনেও প্রতারণা ও ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে অর্থ আদায়কে ‘সম্পৃক্ত অপরাধ’ বলা হয়েছে। দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় প্রতারণা একটি অপরাধ যার জন্য ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হতে পারে।
ড্যাফোডিলস হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. এরশাদ হোসেন বলেন, এই স্কুলের সভাপতি মো.গিয়াস উদ্দিন কবিরের সাথে কথা না বলে তিনি এ বিষয়ে কিছু বলবেন না ।