রাজাকার : রোকনুজ্জামান বিপ্লব

সময়টা ১৯৯৮ সাল। তখন আমি ক্লাস টু-তে পড়ি, মালিকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। চারদিকে পানি আর পানি, আমাদের ক্লাস রুমও পানিতে টইটম্বুর ছিল। আমরা যারা দোহারের বড় রাস্তার পশ্চিম পাশে থাকি তারা প্রতিবছরই বন্যা/বর্ষা দেখি। কিন্তু যাদের বাড়ি বড় রাস্তার পূর্বপাশে তারা বন্যা তো দূরের কথা, বর্ষাও ঠিকমতো চিনে না! কী অবাক করা বিষয়, মাত্র ১০ হাতের একটা রাস্তা আমাদের কত বড় বৈষম্য করে রেখেছে! যাইহোক, তখন একদিন শুনলাম দোহার নূরপুর মাঠে শেখ হাসিনা আসবো। শেখ হাসিনা কে/কি তখন আমি বা আমরা কিছুই জানিনা। এখন তো নূরপুর মাঠ এইযে/খুব কাছে, তখন অনেক দূর ছিল, মানে অনেক দূর মনে হইতো। শেখ হাসিনাকে দেখতে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল কিন্তু ছোট ছিলাম তাই যাইতে পারি নাই। এখন মনে হচ্ছে না যাইতে পারাটাই ভালো ছিল, এমন দজ্জাল মহিলাকে না দেখাই ভালো!
তারপর ধীরে ধীরে সময় যায়, এক সময়ে মালিকান্দা হাইস্কুলে ভর্তি হই ক্লাস সিক্সে, ২০০২ সালে। তখন সরকার বা রাজনীতি কিছুই বুঝি না। ২০০৩ সালে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় আমাদের জ্যামিতি বক্স উপহার দিয়েছিলেন। তখন প্রথম শুনছি তিনি আমাদের স্কুলের সভাপতি। স্কুল জীবনে যখন ধীরে ধীরে রাজনীতি বুঝতে শিখলাম তখন বিএনপি-এর বিভিন্ন কর্মকাণ্ড দেখে যত না খারাপ লাগতো তারচেয়ে বেশি খারাপ লাগতো রাজাকারের দল জামায়াত ইসলাম এর সাথে বিএনপি জোট করেছে এই কারণে। তখন বিরোধীদল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রয়কারী আওয়ামিলীগ, জামায়াতকে আমাদের কাছে রাজাকারদের দল হিসেবে চিনিয়েছে। আমরাও যাই শুনেছি তাই বিশ্বাস করেছিলাম।
আসলে রাজাকার একটি বাংলা শব্দ যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়। এটি মূলত একটি আধা-সামরিক বাহিনী, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহায়তা করেছিল। শব্দটি ফারসি “রাজাকার” থেকে এসেছে, যার অর্থ স্বেচ্ছাসেবক। তবে, ১৯৭১ সালে এই শব্দটি নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়, কারণ রাজাকার বাহিনী মূলত স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল এবং পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেছিল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে, রাজাকার বাহিনী বাঙালি এবং অবাঙালিদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল, যারা স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করে পাকিস্তানি বাহিনীকে সমর্থন করেছিল। তাদের কার্যকলাপের কারণে, শব্দটি বর্তমানে একটি ঘৃণ্য শব্দ হিসেবে বিবেচিত হয়। বর্তমানে, “রাজাকার” শব্দটি ব্যবহার করা হয়, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যারা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল তাদের বোঝাতে। এটি একটি নেতিবাচক শব্দ এবং সাধারণত তাদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতে ব্যবহৃত হয়, যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। যে বিএনপি কে রাজাকারের দলের সাথে জোট করার কারণে অপছন্দ করতাম। এখন দেখি তাদের দলে রাজাকারের সংখ্যা ২০২৬ জন। হায় খোদা, আর যাদের ঘৃণা করতাম তাদের দলে মাত্র ৩৭জন। এই জন্যই তো এখন বিএনপির সমর্থকেরা জামায়াতকে যতই গালাগালি করুক, কখনো রাজাকার বলে গালি দেয় না। কারণ, তারা তো ভালো করেই জানে তাদের ভিতরে রাজাকারের সংখ্যা জামায়াতের চেয়ে ৫০গুনের বেশি। আর ফ্যাসিস্টদের কথা কী আর বলবো, সারাজীবন যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার গান গাইলো তাদের দলে নাকি রাজাকারের সংখ্যা ৮০৬০জন!  ভাবা যায়?
রাজাকার তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে এতোদিন যে হিসাব কষলাম তা তো দেখি এখন পুরোটাই ভুল। রাজনীতির জ্ঞান খুব কম থাকার কারণেই হয়তো এই হিসাব এতোদিন মিলাইতে পারি নাই। শিক্ষার্থীরা কতটা যন্ত্রণা নিয়ে “তুমি কে আমি কে-রাজাকার রাজাকার” এই স্লোগান দিছে কেউই জানতে চায় নাই। এই স্লোগান দিছে রাগে, কেউ দিছে কষ্টে, কেউ দিছে জিদ্দে। এখন বিভিন্ন দলের কিছু কিছু বোকা শিক্ষিত নেতার মুখে রাজাকার নিয়ে কটূক্তি শুনলে হাসবো নাকি আফসোস করবো সেইটা বুঝতে বুঝতে সামনে রাখা গরম চা ঠাণ্ড হয়ে যায়। “ঝাঁজর যদি সুই এর পিছনে ছেদা ক্যান”এই দোষে সুই-রে বকাবকি করে তাহলে সেইটা গলাবাজি ছাড়া কি হতে পারে ?
লেখক
রোকনুজ্জামান বিপ্লব
শিক্ষক
*** লেখাটি লেখকের নিজস্ব। সম্পাদক দায়বদ্ধ। লেখাটির বিষয়ে কোনো আপত্তি থাকলে সংশোধনযোগ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *